****ব্যবসা এবং ব্যাংকঋণ - প্রথম পর্ব**** - Banglar Chokh | True News for All

Breaking

Home Top Ad

Post Top Ad

Monday, May 4, 2020

****ব্যবসা এবং ব্যাংকঋণ - প্রথম পর্ব****


বাঙালী ব্যবসা বিমুখ কারণ ব্যবসা করতে গেলে প্রয়োজন মূলধন। বাঙালীর মূলধনের অভাব আছে। তার একটা বড় কারণ বাঙালী সঞ্চয় করতে পারে না। কারণ ছাতু-লংকা-লেবু খেয়ে তারা থাকতে পারে না। আমিষ তারা খাবেই । শণি-মঙ্গল-বৃহস্পতিবার বাড়িতে নিরামিষ হলেও বাইরে আমিষ খেতে কোন আপত্তি নেই। আয়ের বড় একটা অংশ খরচ হয় মাছ-মাংস-ডিমের ওপর। অনেকের আবার মুর্গি রোচে না, তাদের চাই তিন গুণ দামে কচি পাঁঠা বা খাসির মাংস। মাছ-ডিমের চাহিদা পূরণ করতে ভিণ রাজ্য থেকে আমদানি করতে হয়। তারপর মিষ্টির প্রতি বাঙালীর দুর্বলতা সর্বজন বিদিত। শেষ পাতে 'মধুরেন সমাপয়েৎ' তার চাই। জলো টক দই তার চলবে না, ঘন লাল মিষ্টি দইয়ের ভক্ত সে। খাদ্যাভ্যাস আর শারীরিক কারণে প্রায়ই অসুস্থ হয়। এর মধ্যে পেটের রোগ আর হার্টের অসুখ বেশি। খাবারের পিছনে খরচের পর যে টাকা বাঁচে সেটা খরচ হয় ডাক্তার আর ওষুধের পিছনে। অসুখ সারাতে ছোটে চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, ভেলোর, ব্যাঙ্গালোরে। সুতরাং সঞ্চয় তলানীতে, অর মূলধন তৈরি হয় না। মূলধন চালান হয়ে যায় অন্য রাজ্যে বা অবাঙালী ব্যবসায়ীদের হাতে। তবুও বাঁচোয়া, বাঙালীরা আজকাল আর বই কেনে না। নাহলে ঐ সামান্য সঞ্চয়টুকু শেষ হয়ে যেত।

মূলধন ছাড়া চরিত্রগত কারণেও বাঙালী ব্যবসা করে না। সে কথা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এক শতাব্দী আগেই সবিস্তারে বলে গেছেন, আমার ছোট মুখে সে কথা নতুন করে বলা সাজে না। তবে ইদানীং সরকারি চাকরির সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ার জন্য বাঙালীর নতুন প্রজন্ম ব্যবসা করতে চাইছে। ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে কি পরিবর্তন হয়েছে সেটার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল হচ্ছে। (যুবসমাজ খবরের কাগজ পড়ে না।) নতুন ধরণের ব্যবসার আইডিয়া এবং সুযোগ আসছে। তাই ব্যবসা না করার প্রাথমিক মানসিক বাঁধাটি কাটিয়ে ফেলতে পারলে বাঙালী নবোদ্যমে ব্যবসা শুরু করতে পারে।

ব্যবসার আইডিয়া পাওয়া গেল, মানসিক বাঁধাও দূর হল এবার দরকার মূলধন। সেটা আসতে পারে নিজের ঘর থেকে অথবা বাজার থেকে। একথা ঠিক ব্যবসা করতে গেলে নিজে কোন টাকা ঢালব না, পুরোটাই বাজার থেকে সংগ্রহ করব সেটা সম্ভব নয়। এটা অনেকটা তাস খেলার মতো - তিন জন তাস ফেলেছে, নিজেরটা না ফেললে দান জেতা সম্ভব নয়। তাই যৎসামান্য যা পুঁজি আছে সেটা নিয়েই নামতে হবে। হ্যাঁ, ব্যবসায় ক্ষতির ফলে পুঁজি হারানোর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এটাও সত্যি পুঁজি ঘরে বসিয়ে রাখলে সেই পুঁজি বাড়ার কোন সম্ভাবনা নেই, বরঞ্চ মুদ্রাস্ফীতির জন্য পুঁজির মূল্য দিনে দিনে কমে যাবে।

পুঁজি আসতে পারে সমমনস্ক শেয়ার হোল্ডারদের কাছ থেকে যারা ব্যবসা করতে ইচ্ছুক। শেয়ার হোল্ডারের চরিত্রের উপর নির্ভর করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি হবে পার্টনারশিপ, কোম্পানি বা কোঅপারেটিভ। শুধুমাত্র একজন শেয়ার হোল্ডার হলে বলা হয় প্রোপ্রাইটরশিপ। লাভ-লোকসান পুরোটাই একজন বহন করবে।

পুঁজি জোগার হল, কিন্তু ব্যবসা করতে গেলে এই পুঁজিতে টান পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে গেলে বা কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে সঠিক জোগান ধরে রাখতে হলে মূলধন বাড়ানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা করোনা-লকডাউনের মতো অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে মূলধনে টান পড়বেই। তাছাড়া ব্যবসা করতে গেলে অনেক সময় কিছু বিক্রি বাকিতে বা ক্রেডিটে দিতে হয় ক্রেতার সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদী সম্পর্ক রাখার জন্য। তখন অতিরিক্ত মূলধনের প্রয়োজন হয়।

এই মূলধন তো চট করে জোগাড় করা সম্ভব নয়। তাছাড়া লাভের পুরো টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এই মূলধনের জোগান দেয় কমার্শিয়াল ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে। অনেকের মনেই ভুল ধারণা আছে ব্যাংক ছোট বা ব্যবসায়ীদের ঋণ কেন দেবে। আসলে অনাদায়ী ঋণ (এনপিএ), ব্যাংক জালিয়াতি, রাইটঅফ নিয়ে সমাজে একটা ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক কখনো নিজের টাকা ঋণ হিসাবে দেয় না। বাজার থেকে তাদেরকে টাকা সংগ্রহ করতে হয় এবং তার ওপর সুদ (যত কমই হোক না কেন) দিতে হয়। সুতরাং ব্যাংকের সিন্দুকে টাকা বসিয়ে রাখলে ব্যাংকের লোকসান। ব্যাংক মুখিয়ে আছে টাকা ঋণ হিসাবে দেবার জন্য। এক জন ব্যাংকম্যানেজার বা লোন অফিসারের ওপর সাঙ্ঘাতিক চাপ আছে ভালো ব্যবসায়ীকে লোন দেবার জন্য। কিন্তু উল্টোটাই শোনা যায় ব্যাংকের ম্যানেজারদের না কি লোন দেবার ব্যাপারে বিপুল অনীহা। এটা একটা 'মিথ' আবার একই সাথে কঠোর বাস্তব।

আসলে এক জন ব্যবসায়ী যেমন মূলধন খোঁজে, সে রকম এক জন ব্যাংক ম্যানেজার ভালো কাস্টমার খোঁজে ঋণ দেবার জন্য। কিন্তু যোগাযোগটা সঠিক ভাবে হয়ে ওঠে না। দেশের সরকার সেটা বুঝতে পেরে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।পরবর্তী একটা পর্বে এই নিয়ে বিস্তারিত লিখব। কিন্তু যোগাযোগটাই সব নয়। ব্যাংক মুখ দেখে, জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ দেখে লোন দেয় না। ব্যাংকের নিজস্ব সিস্টেম আছে লোন দেবার সেটার মাধ্যমে ব্যাংক যাচাই করে তবেই লোন দেয়। যাকে লোন দেওয়া হচ্ছে তার ক্রেডিটওয়ার্দিনেস কতটা সেটা ব্যাংক বিচার করে দেখে। আর এখানেই একটা ভুল বুঝাবুঝি তৈরি হয়। উদ্যোগীরা ভাবে ব্যাংক লোন দিতে চায় না, সোজা ভাষায় বলতে গেলে ব্যাংক হ্যারাস করে।

ব্যবসায়ীকে ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে গেলে কয়েকটি নিয়ম মেনে চলতে হবে। পরবর্তী কয়েকটি পর্বে সেগুলোকে সহজ ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করব।
( ক্রমশ: )
লেখক- সঞ্জীব রায়, উচ্চ পদস্থ ব্যাংক আধিকারিক

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad