ব্যবসা এবং ব্যাংক ঋণ - দ্বিতীয় পর্ব - Banglar Chokh | True News for All

Breaking

Home Top Ad

Post Top Ad

Friday, May 8, 2020

ব্যবসা এবং ব্যাংক ঋণ - দ্বিতীয় পর্ব

গত পর্বে লিখেছিলাম ব্যাংকের ম্যানেজাররা লোন দিতে চায় না এটা যেমন 'মিথ' তেমনি বাস্তব। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এমন ব্যবসায়ীকে দেখেছি পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যাংক লোন নিয়ে ব্যবসা শুরু করে নিজের অধ্যবসায় এবং অবশ্যই ব্যাংকের সহযোগিতা পেয়ে পরবর্তীকালে ব্যাংকে তার ঋণের পরিমাণ দঁড়িয়েছে পাঁচ কোটি টাকা। সেই ব্যবসায়ীর নেটওয়ার্থ যে পাঁচ কোটির বেশি সেটা সহজেই অনুমেয়।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংজ্ঞা বলছে "Accepting deposit for the purpose of lending" । ব্যাংকের প্রধান দুটো কাজই হল - আমানত জমা নেওয়া আর ঋণ দেওয়া। লোন দিতে হলে পাবলিকের টাকা জমা নিতে হবে বা পাবলিকের টাকা জমা নিয়ে লোন দিতে হবে। ব্যাংকম্যানেজারকে লোন না দিয়ে অন্য কোন উপায় নেই।

আসলে ব্যাংকের দরজা উদ্যোগীদের জন্য খোলা থাকলেও তারা সঠিকভাবে সেই সুযোগ নিতে পারে না। কখনো লজ্জাবশত যে পরের কাছে 'হাত পাতব' এই মনোভাব আবার কখনো মূল্যায়নের জন্য সঠিক কাগজের অভাবে। যেহেতু ব্যাংক উত্তমর্ণ, তাই ব্যাংকের কাছে আপার হ্যাণ্ড থাকে। লোনের আবেদন উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে বাতিল করার সুযোগ থাকে।

একটা সহজ উদাহরণ দিচ্ছি। ধরা যাক আপনি পাড়াতে একটা স্টেশনারি দোকান চালান। ঐ পাড়াতে এক জন নতুন বাসিন্দা এসেছেন। আপনি তার মুখ চেনেন কিন্তু উনি এর আগে কখনো আপনার দোকান থেকে কোন জিনিস কেনেন নি। এক দিন ঐ ভদ্রলোক আপনার দোকানে এসে পাঁচশ টাকার জিনিস কিনলেন। দাম মেটাতে গিয়ে উনি চারশ টাকা দিয়ে বললেন এই মুহূর্তে ওনার কাছে পুরো টাকা নেই, বাকি টাকাটা উনি দুই দিন পরে দেবেন। আপনি এবার দ্বিধায় পড়লেন। অচেনা খদ্দের, কিরকম চরিত্র আপনি জানেন না। বাকিতে দিয়ে যদি টাকাটা মারা যায়। আপনার কাছে দুটো রাস্তা রয়েছে - ওনাকে শুধু চারশ টাকার জিনিস দেওয়া অথবা একশ টাকা বাকিতে বিক্রি। আপনি মনে মনে হিসেব করে দেখলেন পাঁচশ টাকার জিনিস বিক্রি করে আপনার লাভ হচ্ছে পঞ্চাশ টাকা আর বাকি শোধ না করলে লোকসান একশ টাকা, নেট লোকসান পঞ্চাশ টাকা। আবার বাকিতে জিনিস বিক্রি করলে ঐ ভদ্রলোক নিশ্চয়ই আবার আসবেন মাসকাবারি বাজার করতে। চারিদিকে যা কম্পিটিশন একটু ঝুঁকি না নিলে ব্যবসা দাঁড়াবে কেন ? সব কিছু ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নেবেন আপনি। বাকিতে দিলে হয় তো খাতায় লিখে রাখবেন ওনার বাড়ির নম্বর, মোবাইল নম্বর জেনে নেবেন - এই সব। আপনি যে রিস্ক নিলেন তাকে বলে 'calculated risk' । যদি বাকির পরিমাণ বেশি হত বা ঐ ভদ্রলোক সম্বন্ধে আপনার কাছে বিরূপ ফিডব্যাক থাকত তাহলে আপনার সিদ্ধান্ত অন্য রকম হতে পারত।

ব্যাংকের ক্ষেত্রেও তাই। এক জন অচেনা উদ্যোগী গিয়ে লোন চাইলে ব্যাংক ম্যানেজার দ্বিধায় পড়ে যান। সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি করেন। আর একটা ব্যাপার আছে। আমরা যে পাড়ার স্টেশনারি দোকানের উদাহরণ দিয়েছি সেক্ষেত্রে দোকানের মালিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তার স্বাধীনতা বেশি। আর ব্যাংকম্যানেজার হলেন ব্যাংকের এক জন কর্মচারী, তার সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ সীমিত ব্যাংকের নিয়মকানুনের মধ্যে। উনির নিজের টাকা লোন হিসাবে দিচ্ছেন না, পাবলিকের গচ্ছিত টাকা লোন দিচ্ছেন। বলতে গেলে উনি হলেন একজন ট্রাস্টি। তার পর ওনার ওপর আছে অডিট অফিস, ভিজিল্যান্স ডিপার্টমেন্ট। সুতরাং ওনার দ্বিধার কারণ সহজবোধ্য হলেও সাধারণ পাবলিক এই ব্যাপারগুলি জানে না।

ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার সহজতম রাস্তা হল একটা একাউন্ট খোলা। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইণ্ডিয়া নির্ধারিত কেওয়াইসি দিয়ে একাউন্ট খোলা খুব সহজ। আজকাল বাড়ি বসেও ডিজিট্যাল অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইন একাউন্ট খোলা যায়। কিন্তু শুধু একাউন্ট খুললে হবে না, নিয়মিত লেনদেন করলে তবেই ব্যাংকের কাছে সেই একাউন্টের গুরুত্ব বাড়বে। অব্যবহৃত একাউন্টগুলো আবার ব্যাংকের কাছে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যারা ব্যবসায়ী তাদের সেভিংস একাউন্টের পাশাপাশি কারেন্ট একাউন্ট অবশ্যই থাকা উচিত। ব্যবসায়ের লেনদেন সেভিংসে করা একদম অনুচিত। সব সময় কারেন্ট একাউন্ট ব্যবহার করা উচিত। এই প্রাথমিক নিয়মটা অনেক ব্যবসায়ীই জানেন না বা জেনেশুনে নিয়ম ভাঙেন। এই ভুল করার একটা বড় কারণ, কারেন্ট একাউন্টে মিনিমাম ডিপোজিট পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা। জমা টাকার ওপর ব্যাংক কোন সুদ দেয় না। ৫০০ টাকার মতো ইয়ার্লি সার্ভিস চার্জ নেয়। কোন পাসবুক দেওয়া হয় না, মান্থলি স্টেটমেন্ট দেওয়া হয়। এখন অবশ্য ইন্টারনেট ব্যাংকিংএর মাধ্যমে যে কোন সময়ে ব্যালান্স চেক করা যায়, যত বার খুশি স্টেটমেন্ট নেওয়া যায়। এগুলোকে প্রাথমিক ভাবে অসুবিধা মনে হলেও সুবিধা কিন্তু কম নেই। সেভিংস একাউন্ট থেকে যেমন মাসে পাঁচ বারের বেশি টাকা তুললে চার্জ দিতে হয় কারেন্ট একাউন্টে যত খুশি ট্র্যানজেকশন করা যায়।

মোটামুটি এক বছর ধরে একাউন্টে যদি ভালো ট্র্যানজেকশন করা যায় তাহলে অনেকটাই ব্যাংকম্যানেজারের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। আসলে ব্যাংকএকাউন্টের ট্র্যানজেকশনগুলো হল একরকম 'ফুটপ্রিন্ট' , ব্যাংকের কাছে তার গুরুত্ব অনেক। ঐ গুলো বিশ্লেষণ করে ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধে হয়।

এর পরে যেটি দরকার হয় সেগুলো হল প্রয়োজনীয় নথি। যেমন ট্রেড লাইসেন্স, জিএসটি রেজিস্ট্রেশন, ড্রাগ লাইসেন্স, ফুড লাইসেন্স, ফায়ার ক্লিয়ারেন্স, ইলেকট্রিসিটি কানেকশন, পরিবেশ ছাড়পত্র - যে ব্যবসার জন্য যেরকম দরকার। দোকান / ফ্যাক্টরি যদি ভাড়া বাড়িতে থাকে তাহলে লিজ এগ্রিমেন্ট, ভাড়ার রসিদ লাগবে। লাইসেন্সগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ না কি সময় মতো নবীকরণ হয়েছে এগুলো দেখা হয়। অনেক সময় ব্যবসায়ী রিনিউয়্যাল না করে চালিয়ে নেয়, লোনের প্রয়োজনে দুই-তিন বছর পর রিনিউয়্যাল করায় ফাইন দিয়ে। এই থেকেও ব্যবসায়ীর চরিত্র সম্বন্ধে ব্যাংক ধারণা তৈরি করে।

কতটা লোনের প্রয়োজন, বিগত বছরগুলিতে কি রকম টার্নওভার হয়েছে, আগামী বছরগুলিতে কি টার্নওভার হতে পারে সেই তথ্যগুলি পাওয়া যায় ব্যালান্সশিট এবং প্রজেক্ট রিপোর্ট থেকে। এই ডকুমেন্ট কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের কাছে কিন্তু ইন্ড্রাস্টির ডাটা থাকে যেখান থেকে ব্যাংক প্রজেক্টরিপোর্ট যাচাই করতে পারে। তাছাড়া বিভন্ন রকম 'টুল' ব্যবহার করে প্রজেক্ট রিপোর্ট বিশ্লষণ করে সেটা কতটা বাস্তবসম্মত ব্যাংক পরীক্ষা করে। সঠিক তথ্য প্রজেক্ট রিপোর্টে না দিয়ে ব্যাংককে বিভ্রান্ত করলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করে চার্টার্ড একাউন্ট ফার্ম বা বিভিন্ন কনসালট্যান্ট। এনারা অভিজ্ঞ হলেও প্রায়ই এনাদের তৈরি করা রিপোর্ট অনেক সময় 'টেলরমেড' হয়ে যায় যা বাস্তবের সাথে মেলে না। ব্যাংকের লোন অফিসাররা সরজেমিন এসে দেখে যাচাই করে। গোডাউন বা স্টোরের অবস্থান, সেখানে কতটা মাল ধরে, সাপ্লায়ার, ক্রেডিটর, ডেটররদের তালিকা চেক করে। এক কথায় বাজার থেকে ব্যবসায়ীর সততা, দক্ষতা সম্পর্কিত তথ্য জোগাড় করে একটা সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করে। ( সিবিল ক্রেডিট রিপোর্ট থেকে অনেক তথ্য পাওয়া যায়, পরের একটা পর্বে আলোচনা করা যাবে সেটা নিয়ে।) লোনের জন্য যিনি আবেদন করলেন তার পার্সোনাল ইন্টারভিউ করে জানা হয় ব্যবসার ব্যাপারে ওনার কি রকম আন্তরিকতা আছে সেটাও বিবেচনা করা হয়।

সব কিছু ঠিকঠাক চললেও লোন আটকে যেতে পারে সিকিউরিটির প্রশ্নে। ব্যাংক কি সিকিউরিটি নেয়, কতটা পরিমান নেয় বা আদৌ সিকিউরিটির প্রয়োজন আছে কি না পরের পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ক্রমশ :
প্রথম পর্ব-
https://www.banglarchokh.in/2020/05/blog-post_8.html
(লেখক- সঞ্জীব রায়, উচ্চপদস্থ ব্যাংক আধিকারিক)

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad