দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পুরস্কারের তালিকায় বাংলার সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারী - Banglar Chokh | True News for All

Breaking

Home Top Ad

Post Top Ad

Monday, September 30, 2019

দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পুরস্কারের তালিকায় বাংলার সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারী

গরীব নমঃশূদ্র পরিবারে জন্ম! সবে হাঁটতে চলতে শেখা হয়ত, বয়স বছর তিনেক। দেশভাগ হয়েছে পাঁচ-ছ বছর আগে। ওপার বাংলা থেকে হাজারে হাজারে শরণার্থী তখনও এদেশে আসছে, সালটা ১৯৫৩। কি তার পরিচয়? তার দেশের নাম কি? এসব জানার বা বোঝার বয়স হয়নি তখনো, বাবা মা ও ভাই বোনদের সাথে পাড়ি অনিশ্চয়তার পথে, বদলে গেল দেশের নাম, ঠাঁই হলো বাঁকুড়ার রিফিউজি ক্যাম্পে। আদেশ এলো সেখান থেকে দণ্ডকারণ্যে যাওয়ার। কিন্তু মানতে রাজী হয়নি বাবা, ক্যাম্প থেকে নাম কাটা গেল। শুরু হল কঠিন লড়াই, মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজার লড়াই, পেটের ভাত জোগাড়ের লড়াই। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো পরিবার মাথার উপর থেকে যেন আকাশটাও হারালো। শুরু হলো এক বালকের লড়াই। যে বয়সে স্কুলের ব্যাগ কাঁধে ওঠে, মন পড়ে থাকে খেলার মাঠে- সে বয়সে গরু চড়ানো, চায়ের দোকানে মজুরি করে উপার্জনের চেষ্টা শুরু। চোখের সামনে দিদিকে ক্ষিদেতে শুকিয়ে মরতে দেখেছেন। কখনো ভাগ্য বশত ক্ষুদ খেয়েছেন, নয়ত অনাহারেই কেটেছে। জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, গুয়াহাটি, লখনৌ, বেনারসে হন্যি হয়ে ঘুরেছেন, বেগার খেটেছেন। তারপর আবার ফিরেছেন কলকাতায়। হোটেলে পেটপুরে খাবার খেয়ে দৌড়ে পালিয়েছেন, ক্ষিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। যাদবপুর স্টেশন চত্বরে রিক্সা চালানো শুরু, চাকু-বোমা ধরায় হাতেখড়ি, দিবারাত্র মদে ডুবে থাকা, পেটের দায়ে অপরাধ, শেষ নকশাল আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে যোগদান- রোজ রোজ জীবনের গতিপথ বদলেছে। প্রতিটা দিন জীবন তাকে নতুন শিক্ষা দিয়েছে। শেষে তাঁর দুবেলা খাবার জোটে - না খেলে যেখানে মারধোর হয়, ঠাঁই হয় তাঁর সেই জেলখানায়। এই জেলেই বন্দী থাকা এই আসামীর সংস্পর্শ তাঁকে বদলে দেয়। বৃদ্ধ আসামীটি শিক্ষিত ও জ্ঞানী ছিলেন, তিনি তাঁকে বাঁচার জন্য রসের সন্ধান দিলেন, পড়াশোনার পথ দেখালেন, নিজে অবতীর্ণ হলেন শিক্ষক ও বই রূপে, জেলখানার উঠান হলো স্লেট, গাছের ভাঙা সরু ডাল তার পেনসিল, শুরু হলো নতুন এক সাধনা। এক জেলার তাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়ে জেলেই বইয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন, এক কয়েদি বইয়ে ডুব দিলেন নিজেকে খুঁজতে, জগতের সাথে নিজেকে জুড়তে। জেল থেকে বেরোলেন, রিক্সা চালানো চললো, এবার আর বোমা-চাকু না, অবসরে সর্বক্ষণের সাথী বই, আরও বই।

একদিন তাঁর রিক্সায় ওঠা এক ভদ্রমহিলাকে সাহস করে জিজ্ঞেন করলেন 'জিজীবিষা' শব্দের অর্থ। রিক্সাচালকের এহেন প্রশ্নে কৌতূহল জাগলো মহিলার, তিনি শব্দটির অর্থ বলেই থামলেন না, চললো আরও কথোপকথন। নিজের ম্যাগাজিনে ওই রিক্সাচলককে নিজের গল্প লিখতে বললেন। ভদ্রমহিলা রিক্সাচালককে নিজের বাড়ির ঠিকানা দিলেন, রিক্সাচালক হাতে নিয়ে দেখলেন, ওই ভদ্রমহিলা আর কেউ নন, স্বনামধন্য লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। রিক্সাচালকের কথায়, মহাশ্বেতা দেবীর সাথে দেখা না হলে হয়ত তিনি বইপড়া, শিক্ষিত এক রিক্সাচালকই রয়ে যেতেন। কিন্তু তাদের ওই সাক্ষাত সবকিছু বদলে দিল, নানা পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা বেরতে থাকলো। তাঁকে চিনতে শুরু করলো বাংলা। জন্মসূত্রে অচ্ছুত বলে কেউ পাত্তা দিত না, কিন্তু তাঁর গুণগ্রাহীর সংখ্যা বাড়ল লাফিয়ে লাফিয়ে, উচ্চবর্ণের ভদ্দরলোক বাবুরাও তাঁকে একটু সম্মান দিতে শুরু করলেন।

তারপর আবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় উদ্বাস্তুদের ঢল নামে পশ্চিমবঙ্গে, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতাও চরমে। উদ্বাস্তু কাকার ছেলের সাথে হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে মধ্যপ্রদেশে চলে যাওয়া, গাছ কেটে বিক্রি করে উপার্জন শুরু ও দিনভর মদে ডুবে থাকা। পরবর্তীতে মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত শ্রমিক নেতা ও তাত্ত্বিক শংকর গুহ নিয়োগীর সংস্পর্শে এসে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হন। বেশ কয়েকবছর পর আবার কলকাতায় ফেরা, আবার শুরু লেখালিখি, কলম হাতে আবার যুদ্ধ ঘোষণা। সে যুদ্ধ ক্ষিদের বিরুদ্ধে, সে যুদ্ধ জাতপাতের বিরুদ্ধে, সে যুদ্ধ কঠিন-কঠোর জীবনের বিরুদ্ধে। এবার তাঁর জেতার পালা। প্রকাশিত হতে থাকল একের পর এক উপন্যাস, বই। তাঁর আত্মজীবনী হাজারে হাজারে বিক্রি হচ্ছে, বইয়ের নাম 'ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন'। কিন্তু এখনও তাঁর জীবন আর পাঁচটা এলিট সাহিত্যিকের মতো না। একটি মূক ও বধির স্কুলের হোস্টেলের রাঁধুনি তিনি, দুবেলা ১৫০ জন করে মোট ৩০০ জনের রান্না করেন, বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। তারপর পড়াশোনা ও এত সুন্দর সুন্দর লেখা।


তাঁর লেখা নিয়ে প্রশংসা শুনে তিনি বলেন সুন্দর লিখতে আসেননি, তিনি এসেছেন তাঁর ভেতরের কষ্টের কথা বলতে, তাঁর লড়াইয়ের কথা বলতে, জাতপাতের বেড়াজাল ছিন্ন করতে। তিনি নিজেকে খেলোয়াড় বলেন। তিনি এসেছেন পিছিয়ে পড়া দলিত শ্রেণীর মানুষকে লড়াইয়ের বার্তা দিতে, তিনি এসেছেন তাদের অধিকারের কথা বলতে। বিমানেই চড়ুন আর ট্রেনেই চড়ুন, তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী তাঁর গামছা। তাঁর কথায় তিনি সাথে গামছা রাখেন, তাঁর শিকড়কে মনে রাখার জন্য, তিনি যাতে এই ভদ্দরলোক বাবুদের মাঝে নিজের লড়াইয়ের কথা ভুলে না যান। গামছা ঘাম-রক্ত মোছে, গামছা অনেকের বিছানা, অনেকের শীতবস্ত্র, গামছা অনেকের কাছে ছাতা, গামছা সব লড়াইয়ের সাক্ষী।

এতক্ষণ যাঁর কথা বললাম, তিনি মনোরঞ্জন ব্যাপারী, দেশের অন্যতম সেরা সাহিত্যিক। তিনি বাংলা ও বাঙালির গর্ব। তাঁর আত্মজীবনী 'ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন' ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে, 'Interrogating My Chandal Life: An Autobiography of a Dalit', অনুবাদক শিপ্রা মুখার্জী। এই বইটির জন্যে তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং জাতীয় স্তরের বিভিন্ন পুরস্কার । 
২০১৮এর জানুয়ারি মাসে ‘দ্য হিন্দু’র সেরা লেখক বলে বিবেচিত হয় তাঁর নাম। সত্তর ছুঁইছঁই মানুষটি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, “এই আনন্দ শুধু আমার নয়, যাদের বঞ্চিত করা হয় তাদের সকলেরই”।


এবার তার মুকুটে জুড়ল আরেকটি পালক ।দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যের সব থেকে ওজনদার পুরস্কার ডিএসসি প্রাইজের ২০১৯ সালের লংলিস্টে যে পনেরোটি উপন্যাস স্থান পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের  সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারীর ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’র ইংরেজি অনুবাদ ‘দেয়ার্স গানপাউডার ইন দি এয়ার’। এটি অনুবাদ করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক অরুণাভ সিংহ। সম্প্রতি দিল্লিতে এই লংলিস্টের ঘোষণা করেন পাঁচ সদস্যের আন্তর্জাতিক জুরির প্রধান এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির প্রাক্তন অধ্যাপক হরিশ ত্রিবেদী।

লংলিস্টে মনোনীত উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে রয়েছে অকিল কুমারস্বামীর ‘হাফ গডস’, অমিতাভ বাগচির ‘হাফ দ্য নাইট ইজ গন’, ফতিমা ভুট্টোর ‘দ্য রানাওয়েজ’, রাজকমল ঝা’র ‘দ্য সিটি অ্যান্ড দ্য সি’ এবং পেরুমল মুরুগনের ‘আ লোনলি হারভেস্ট’। পনেরোটি উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে তিনটি অনুবাদ – বাংলা, তামিল ও মালয়ালম থেকে। মোট ৯০টি বই থেকে ১৫টি বেছে নেওয়া হয়। আগামী ৬ নভেম্বর লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে পাঁচ বা ছ’টি বইয়ের শর্টলিস্ট ঘোষণা করা হবে। ১৬ ডিসেম্বর, পোখরায় আইএমই নেপাল সাহিত্য উৎসবে বিজেতার নাম ঘোষিত হবে।

২০১১ সাল থেকে এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। প্রতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার কোনও শহরের সাহিত্য উৎসবে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য গতবছর বাংলা পক্ষ সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারীকে বাংলার জাতীয় গৌরব শিরোপা দিয়ে সম্মানিত করেছিল ।







No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad