কালনার প্রযুক্তিবিদ ও আবিষ্কারক শ্রীনারায়ণ চন্দ্র মুখার্জী - Banglar Chokh | True News for All

Breaking

Home Top Ad

Post Top Ad

Saturday, July 13, 2019

কালনার প্রযুক্তিবিদ ও আবিষ্কারক শ্রীনারায়ণ চন্দ্র মুখার্জী

( লেখক : মনোজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় )

ছোটবেলায় একটা নতুন কোন খেলনা পেলে সেটা কি করে কাজ করে , এই প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনেই জাগতো। তার উত্তর পেতে সেই খেলনাকে খুলে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আবার নতুন করে জোড়া লাগানোর মধ্যে ছিল এক অনাবিল আনন্দ। সেই আনন্দকে সারা জীবন ধরে বহন করার সাহস দেখাতে পারেন কতিপয় ব্যক্তি, তেমনি একজন পূর্ব বর্ধমানের মহকুমা শহর কালনার প্রযুক্তিবিদ ও আবিষ্কারক শ্রী নারায়ণ চন্দ্র মুখার্জী।

স্থানীয় অম্বিকা স্কুলে পড়াকালীন অষ্টম শ্রেণীতেই তৈরী করেছিলেন রেডিও সেট, এখন খুব শক্ত বলে মনে না হলেও ছয়ের দশকে এটা মোটেই সহজ ছিল না। নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন তৈরী করেন পারদবিহীন বার্লোস হুইলের এক মডেল, এটি বর্ধমান শহরে অনুষ্ঠিত এক বিজ্ঞানমেলায় প্রথম স্থান পায়। মনে রাখা দরকার তখন এতো বিজ্ঞান প্রদর্শনী বা প্রতিযোগিতার ব্যাপার ছিল না। ছোটবেলার এই ভালোবাসাকে সার্থক করতেই কালনা কলেজ থেকে বি এস সি তে ভর্তি হয়েও পড়া শেষ না করেই, হুগলী ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (HIT) তে ইলেকট্রিক্যালে ডিপ্লোমায় ভর্তি হন ও ১৯৭১ সালে উত্তীর্ণ হন।

এরপর ছোটখাটো কিছু বেসরকারী সংস্থায় কাজ করেন কয়েক বছর। এই পর্যন্ত গল্পে নেই নতুনত্ব কিছু, কিন্তু নতুন কিছু উদ্ভাবনের নেশা যাঁর তিনি গতানুগতিকতায় খুশী হবেন কি করে? ১৯৭৫ সালে নিজের বাড়িতেই শুরু করলেন নিজের স্বপ্নের ওয়ার্কশপ , প্রথমে পরিচিতির সূত্রে পাম্পের মোটর, ট্রান্সফর্মার ইত্যাদির সার্ভিসিং এর গতানুগতিক কাজ করলেও তাঁর উদ্ভাবনী দক্ষতার উড়ান শুরু এই সময়ই।

কাজ করতে গিয়ে দেখলেন অনেক প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির বাজারমূল্য অনেক অথচ কর্মক্ষমতা ততোটা নয়। নিজেই তৈরী করে ফেললেন ট্রান্সফর্মার কয়েল ওয়াইন্ডিং মেশিন, কার্যক্ষমতা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যন্ত্র ,যেসব আজও কাজ করে চলেছে তাঁর শপে। ইতিমধ্যেই ১৯৮১ তে কালনা পৌরসভায় চাকুরিতে যোগদান, যা প্রাথমিকভাবে তাঁর নিজস্ব কাজের জগতে হয়তো কিছুটা বাধাই হয়েছিল তাঁকে স্বাধীন ব্যবসার জগৎ থেকে সরতে হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর বহু স্মরনীয় কাজের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই পৌরসভা। আজ রিমোটের মাধ্যমে কোন অনুষ্ঠানের সূচনা বা পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে আমরা পরিচিত, কিন্তু আমাদের রাজ্যে এই পদ্ধতির সূচনা শ্রী মুখার্জীর হাত ধরেই। ১৯৯৪ সালে কালনা পৌরসভার ১২৫ বছর পূর্তি উৎসবের সূচনায় তিনি প্রথম এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা ভীষণ প্রশংসিত হয়। তৎকালীন সংবাদপত্রগুলি তার সাক্ষ্য বহন করছে। এরপর ১৯৯৭ বর্ধমানে জাতীয় স্কুল ফুটবল, ১৯৯৯ কালনায় জেলা ছাত্রযুব উৎসবে এই পদ্ধতি সফলভাবে ব্যবহার করেন। কলকাতায় বোস ইন্সটিটিউটে তৎকালীন ISRO র প্রধান ইউ. আর. রাও তাঁর এই পদ্ধতির প্রশংসা করেছিলেন। এই সাফল্যই তাঁকে ফের টেনে আনলো গবেষণার জগতে।

নিজস্ব সার্কিটের মাধ্যমে তৈরী করেন সিঙ্গেল ফেস প্রিভেন্টের | তবে তাঁর শ্রেষ্ঠ সাফল্যও এল এইসময় | তৈরী করে ফেললেন অটোমেটিক ওয়াটার পাম্প কন্ট্রোলার | জলের অপচয় রোধে ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে যার অবদান অনবদ্য। এই যন্ত্রটি পাম্পের সঙ্গে যুক্ত রাখলে জলের ট্যাঙ্ক খালি হলে , পাম্প চালু হয়ে যাবে এবং ভর্তি হয়ে গেলে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। এতে জলের অপচয় বন্ধ হবে, বর্তমান যুগে যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাছাড়া ভোল্টেজের বারাকমার জন্য মোটরের যাতে কোন ক্ষতি না হয় সেই ব্যবস্থাও রয়েছে। এই আবিষ্কারটি ২০০৪ সালে ন্যাশনাল টেস্ট হাউস দ্বারা স্বীকৃতি লাভ করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক সংস্থা লাইট & পাওয়ার এটির একমাত্র উৎপাদক হিসাবে চিহ্ণিত হয়।

ইতিমধ্যে তাঁর আরো একটি কাজ উচ্চ প্রশংশিত হয় | পৌরসভার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে দেখেছিলেন পথবাতিগুলি অনেক সময়ই ঠিক সময় জ্বালানো বা নেভানো হয় না | আবার ঐ ফেজ থেকেই বিদ্যুৎ চুরিও হয়, ফলে আর্থিক বোঝা চাপে পৌরসভার কাঁধে।এই সমস্যা দূর করতে তৈরী করলেন স্বয়ংক্রিয় আলো জ্বালানো ও নেভানোর যন্ত্র, যা আটকাবে বিদ্যুৎ চুরিও, নাম দিলেন অটোমেটিক নাইট গার্ড লাইট | ২০০৯ সালে কালনা পৌরসভায় এই ব্যবস্থা চালু হয়। সেই সময় এটি উচ্চ প্রশংসা লাভ করে, আনন্দবাজারের মতো প্রথম সারির সংবাদপত্র এই বিষয়ে খবর করে।

এরপর চাকুরিজীবন থেকে অবসরের পর শারীরিক সমস্যায় কিছুটা বিরতি পড়লেও তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন নতুন কিছু উদ্ভাবনের যা সাধারনের কাজে আসবে, সেই সঙ্গে তৈরী করবে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। তাঁর সংস্থা লাইট & পাওয়ার আগামীদিনে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপননের ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত তৈরী করুক এটা তাঁর স্বপ্ন। এ ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র মানস মুখার্জী, বাঙালি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও সফল হতে জানে এটা প্রমাণ করাই তাঁদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। নারায়ণবাবু বলেন, একটি সংস্থার সাফল্য তো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয় সামাজিকও। স্থানীয় ছেলেদের কর্মসংস্থান হবে উৎপাদন থেকে বিপণন বিভিন্ন ক্ষেত্রে, এটাই হবে তাঁর প্রয়াসের সার্থকতা।

আমরাও চাই এই জ্ঞানতাপসের স্বপ্ন সার্থক হোক, তাঁর উদ্ভাবনী শক্তির উত্তরাধিকার বহন করুক লাইট & পাওয়ার | এগিয়ে যাক বাণিজ্যিক সাফল্যের পথে , 'বাঙালির ব্যবসা হয়না' র মতো মিথ ধ্বংস করে আসুক সাফল্য। বিপণনের ক্ষেত্রে আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাই স্বাগত এই যাত্রা পথে। এই ব্যতিক্রমী ব্যক্তির বিচিত্র সৃষ্টিশীলতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম, বাঙালির নতুন প্রজন্ম আশা করি উদ্বুদ্ধ হবে।

-----------------------------------------------------------------------
(শ্রী নারায়ণ চন্দ্র মুখার্জীর ইচ্ছানুসারে ওনার কোন ছবি প্রকাশ করলাম না। উনি চান ওনার কাজকে সবাই চিনুক, নিজে থাকতে চান অন্তরালেই)





No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad