বি ই কলেজ(শিবপুর) এর ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি: অভীক মণ্ডল - Banglar Chokh | True News for All

Breaking

Home Top Ad

Post Top Ad

Tuesday, July 2, 2019

বি ই কলেজ(শিবপুর) এর ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি: অভীক মণ্ডল

বি ই কলেজ(শিবপুর) ভারতের প্রাচীনতম ও অগ্রণী ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হাওড়া শহরের শিবপুরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয় ভারতে ও বহির্ভারতে শিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফলিত বিজ্ঞান শাখার একটি উৎকৃষ্ট প্রতিষ্ঠানরূপে স্বীকৃত।  উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এটি বর্তমানে ভারতের একটি অভিজাত শিক্ষাকেন্দ্র।


সালটা ১৮৪৩-৪৪| বাংলার পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টে এই সময় কিছু সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এর দরকার হয়| সেই জন্যে তদানীন্তন বেঙ্গল এডুকেশন কাউন্সিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাঠ্যক্রম চালু করতে উদ্যোগী হয়  | ২৪ নভেম্বর, ১৮৫৬ সাল থেকে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে যাত্রা শুরু করে এই কলেজ | তখন এই কলেজ এর নাম ছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ |
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রতিষ্ঠা হয় ২৪ জানুয়ারী, ১৮৫৭ | ওই বছরেরই মে মাস থেকে ওই কলেজটি  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পায় | ১৮৬৪ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রথম ব্যাচ বেরোয় এবং মাত্র ২ জন ছাত্র সেই বছর পাস করে | ১৮৬৫ সালে ওই কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজের সাথে যুক্ত হয় এবং ১৮৬৫ থেকে ১৮৬৯ এই কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট বলে পরিচিত হয় | ১৮৮০ সালে কলেজটি বর্তমানের হাওড়া এর শিবপুরে স্থানান্তরিত হয় | তদানীন্তন বিশপস কলেজ এর ক্যাম্পাসে ক্লাস চালু হয় এবং তখন এই কলেজ এর নাম হয় গভর্নমেন্ট কলেজ, হাওড়া | ১৮৮৯ সালে কলেজটি পূর্ণ আবাসিক কলেজে রূপান্তরিত হয় | ১৯২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পুনরায় নাম পরিবর্তন করে এই কলেজের নাম বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বি. ই. কলেজ, শিবপুর) রাখা হয়। শিবপুর শব্দটি অবশ্য ১৯২১ সালের ২৪ মার্চ মুছে ফেলা হয়। ১৯২১-১৯৪৩ এর মধ্যে শ্রী আর.এন.মুখার্জী এর নেতৃত্বে "মুখার্জী কমিটি" এর তত্ত্বাবধানে বি. ই. কলেজ এ আরো অনেক নতুন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট চালু করা হয় | ১৯৩২ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রথম ব্যাচ পাস আউট হয় | ১৯৩৫-৩৬ সালে চালু হয় ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ| ১৯৩৯ সালে চালু হয় মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ | ধীরে ধীরে ১৯৪৭ সালে চালু হয় অ্যাপ্লায়েড মেকানিক্স বিভাগ | ১৯৪৯ সালে চালু হয় আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট | ১৯৪৯ সাল থেকেই সমস্ত বিভাগকে নতুন বিল্ডিংএ স্থানান্তরিত করা হয় | ১৯৫৪ সাল থেকেই চালু হয় মেকানিক্যাল, সিভিল, ইলেকট্রিকাল ও মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয় | ১৯৫৬ সালে চালু হয় ইলেকট্রনিক্স ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ | ১৯৮২ সালে চালু হয় কম্পিউটার সাইন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ |

১৮৫৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত কলেজ ছিল। জাতির প্রতি এই প্রতিষ্ঠানের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯২ সালে এই কলেজটিকে ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়া হয়। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. শঙ্করদয়াল শর্মা ১৯৯৩ সালের ১৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়টি উদ্বোধন করেন। ২০০৪ সালের ১ অক্টোবর ডিমড বিশ্ববিদ্যালয় বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এর বর্তমানে নামে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়। ২০০৫ সালের ১৩ জুলাই ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আব্দুল কালাম আনুষ্ঠানিকভাবে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, শিবপুর (বেসু)-র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ২০১৪ সালে ভারত সরকার বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, শিবপুর কে কেন্দ্রীয় কলেজ হিসাবে স্বীকৃতি দেয় এবং নাম পরিবর্তন করে হয় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সাইন্স এন্ড টেকনোলজি |
শিবপুর বি ই কলেজ- নামটা বাংলার মানুষ এক কথায় চেনে। বাংলার গর্ব এই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। বাংলার বহু কৃতি ছাত্রছাত্রী এই কলেজ এর প্রাক্তনী | কেন্দ্রীয় সরকারি হয়ে যাওয়ার পর কলেজ এর স্টেটাস বাড়লো, অধ্যাপক অধ্যাপিকাদের মাইনে অনেকটা বেড়ে গেলো | কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে প্রাপ্ত সাহায্যের পরিমাণ বাড়লো |

কিন্তু কি পেল বাংলার মানুষ? কি লাভ হল বাঙালির?

১. প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে বর্তমানে শিবপুরে ৫০% আসন রাজ্যের ছেলেমেয়েদের জন্যে এবং ৫০% আসন বাইরের রাজ্যের ছেলেমেয়েদের জন্যে সংরক্ষিত | ফলে একধাক্কায় রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ৫০% আসন কমে গেলো | প্রতি বছর বাংলার ২৫০-৩০০ ছেলেমেয়ে সরকারি ইঞ্জিয়ারিং কলেজে পড়ার সুযোগ হারাল। যা বাংলার ক্ষতি, বাংলার ছেলেমেয়েদের ক্ষতি।
২. বর্তমানে শিবপুরে ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট এন্ট্রান্স এর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী ভর্তি নেওয়া হয় না | ভর্তি নেওয়া হয় আই আই টি প্রবেশিকা পরীক্ষার( JEE Mains ) মাধ্যমে |

অনেক মত এতে নাকি কলেজ এর উৎকর্ষতা, মান বেড়ে গেছে, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বৈচিত্র বেড়ে গেছে | আমার প্রশ্ন কিসের বৈচিত্র কিভাবে বেড়েছে ? আর এই বৈচিত্র বাড়িয়ে আমাদের বাংলা এর গরিব ছেলেমেয়েদের কি লাভ? যে কলেজ এ অধিকাংশ ছেলেমেয়েরাই আজ উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত কিংবা শহরের, সেখানে কিসের বৈচিত্র ? বৈচিত্র সেদিন বাড়বে যেদিন পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ , কোচবিহার, বর্ধমান , বীরভূম , হুগলী , দিনাজপুর , দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ার , জলপাইগুড়ি , মেদিনীপুর , উত্তর ২৪ পরগনা , দক্ষিণ ২৪ পরগনা , মালদা, নদীয়া তথা সমস্ত গ্রাম বাংলার মেধাবী ছেলেমেয়েরা ওই কলেজএ পড়ার সুযোগ পাবে | আর এতদিন শিবপুর এ সেটাই হয়ে এসেছে | আবার বলছি শিবপুর কে কারা বানিয়েছে ? শিবপুর কে বানিয়েছে বাংলার ছেলেমেয়েরা | শিবপুর ছিল বাঙালি তথা দেশ এর গর্ব | কিন্তু আজ বাঙালি ছাত্রছাত্রীরাই ওই কলেজ এ বহিরাগত |

আমি সাধারণ পরিবারের ছেলে | তাই সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েদের ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট এর মাধ্যমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আর শিবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার মানে কি বোঝায় সেটা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল | যাদবপুর আর শিবপুরে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে বহু ছেলেমেয়ে ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট পরীক্ষায় বসে | কিন্তু বর্তমানে শিবপুর এ ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট দিয়ে আর ভর্তি হয় না | ভর্তি নেওয়া হয় আই আই টি প্রবেশিকা পরীক্ষার( JEE Mains ) মাধ্যমে | যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া রাজ্যবোর্ডের ছেলেমেয়েদের কাছে দুঃসাধ্য | তার পাশে ঢুকলো আকাশ, ফিটজি এর মতো নামীদামী কোচিং সেন্টার, যেখানে পড়া একটা সাধারণ ছেলের পক্ষে অসম্ভব | এই সব কোচিং এ পড়ার খরচ বছরে কমপক্ষে ১.৫ লাখ। গরীব মানুষের পক্ষে এ ব্যয় বহন অসম্ভব। এখানেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে গরীব ছেলেমেয়েরা। মেধা নয়, টাকার কাছে হেরে যাচ্ছে গরীব ছেলেমেয়েরা। পরিশ্রম করে কেউ কেউ সফল হচ্ছে, কিন্তু সেটা স্বাভাবিক নয়। ক্ষতি হলো সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েদের, ক্ষতি হলো গ্রামবাংলার ছেলেমেয়েদের, ক্ষতি হলো রাজ্য বোর্ডের ছেলেমেয়েদের, যেখানে রাজ্যের ৭৫%-৮০% ছেলেমেয়ে পড়ে| তাদের শিবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া এখন অলীক স্বপ্ন |

আমরা কেন্দ্রীয় সরকারি কলেজ চাই। বাংলায় অনেক কেন্দ্র সরকারি কলেজ হোক। কিন্তু রাজ্য সরকারি ভালো কলেজ গুলোকে ধ্বংস করে কেন্দ্রীয় কলেজ বানিয়ে না। নতুন নতুন কেন্দ্র সরকারি কলেজ হোক। আমরা তো চাই বাংলায় আই আই টি খড়গপুরের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক। কিন্তু শিবপুর কে কেন্দ্রীয় কলেজ বানিয়ে বাংলার যে ক্ষতি হয়েছে- তা চাই না।

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad